ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অনিন্দ্যসুন্দর আলতাপরি

    Sylhet 21
  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : May 16, 2026 ইং 39 বার পঠিত
ছবির ক্যাপশন:
ad728
বিরল ও দুর্লভ পাখির সন্ধানে গত ১১ জানুয়ারি রাতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের উদ্দেশে রওনা হলাম। সকালে পৌঁছে গাইড নাহিদুল ইসলামের গেস্টহাউসে ব্যাগপত্র রেখে নাশতা সারলাম। এরপর নাহিদসহ আলোকচিত্রী ইমরুল হাসান ও ডা. আশিকুর রহমানকে নিয়ে পাখির খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। পাক্কা দুই ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে বিরল রাজপেঁচাসহ ১৮ প্রজাতির পাখির ছবি তুললাম।এরপর পাহাড় পানে এগিয়ে গেলাম। পাহাড়টি মোটামুটি উঁচু। হাঁটুতে সমস্যা, তাই পাহাড়ে উঠতে ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু নতুন পাখি পাওয়ার আশা ও পক্ষিসঙ্গীদের অনুরোধে পাহাড়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নিলাম। যাত্রাপথে আরো ছয় প্রজাতির পাখি দেখলাম। প্রায় ৫০ মিনিট হাঁটার পর চমৎকার এক জায়গায় পৌঁছলাম। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর রাঙা বউ নামের চমৎকার এক পাখির দেখা পেলাম। পাখিটি জীবনে এই প্রথম স্বচক্ষে দেখলাম। ওর ছবি তুলে কিছুক্ষণ পর সিংহরাজের (ভীংরাজ) ছবি তুলতে গিয়ে গাছের পড়ে থাকা কাণ্ডের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা পেলাম। এরপর পাহাড়ি রাস্তার এক পাশে ফোল্ডিং টুলে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসলাম। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই অতি সুন্দর পুরুষ নীলশির দামার আগমনে ব্যথার কথা ভুলে গিয়ে ক্যামেরায় ক্লিকের বন্যা বইয়ে দিলাম। অনিন্দ্যসুন্দর আলতাপরিনীলশির দামার ছবি তুলে আরেকটি বিরল পাখি দেখার আশায় পাহাড়ের একেবারে উঁচুতে যাত্রা করলাম। দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচুতে উঠলাম। কিন্তু জায়গামতো গিয়েও পাখিটির দেখা পেলাম না। তবে ঠিক ৩৩ সেকেন্ড পর হলদে-কালো অতি সুন্দর এক পাখি এসে ডালে বসল। নতুন পাখি না পেলেও এই পাখির রূপে মুগ্ধ হয়ে ওর কিছু ছবি তুললাম। এটি একটি স্ত্রী পাখি। পুরুষটি হয়তো আশপাশেই আছে। সেটি আরো সুন্দর। এরপর একটু সামনের দিকে এগিয়ে আরেকটি স্পটে গেলাম। এটিই বিরল পাখিটি দেখার শেষ স্পট। কিন্তু এখানেও পাখিটির দেখা পেলাম না। অথচ এ সময় স্পট দুটিতে সচরাচর পাখিটিকে দেখা যায়। যা হোক, এই স্পটটিতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। দুপুর তখন ১টা ৩২ মিনিট বেজে ৩৩ সেকেন্ড। হঠাৎ গাছের ডালে সেই হলুদ স্ত্রী পাখিটি এসে বসল। ওর ছবি তুলতে তুলতেই অতি সুন্দর টকটকে লালের ওপর কালো রঙের পুরুষটি এসে হাজির হলো। আর যায় কোথায়? তিনজনের ক্যামেরার ক্লিকের ধ্বনিতে পাহাড়চূড়া যেন কেঁপে উঠল। লাল ও হলুদ অতি সুন্দর পাখি দুটি সর্বপ্রথম দেখি মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে, ৮ এপ্রিল ২০১১-এ। ওদের চোখ-ধাঁধানো রূপে আমার মন ভরে গিয়েছিল। মনোমুগ্ধ হয়ে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম জানি না, তবে প্রথম দর্শনে ওদের সৌন্দর্যে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে ক্যামেরায় ক্লিক করতেই ভুলে গিয়েছিলাম! এতক্ষণ রূপলাবণ্যে ভরপুর অনিন্দ্যসুন্দর যে পাখি দম্পতির কথা বললাম, ওরা এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি আলতাপরি। রাঙা বউ, সিঁদুরে সহেলি, সিঁদুরে-লাল সাত সহেলি বা সিঁদুরে সাত সাইলি নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Scarlet or Orange Minivet। ক্যাম্পোফাজিডি গোত্রভুক্ত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Pericrocotus flammeus। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত। আলতাপরি ছোট আকারের পাখি। লম্বায় মাত্র ২২ সেন্টিমিটার। ওজন মাত্র ২৬ গ্রাম। পুরুষটির বুক, পেট ও লেজের তলা আলতা-লাল। মাথা, গলা, পিঠ ও লেজের উপরিভাগ চকচকে কালো। কালচে ডানায় দুটি আলতা-লাল পট্টি। কোমর আলতা-লাল। পুরুষ ও স্ত্রীর পালকের রঙে বেশ পার্থক্য থাকে। তবে প্রথম দর্শনে স্ত্রীটিকে দেখতে পুরোপুরি হলদে বলেই মনে হবে। স্ত্রীর কপাল, গলা, বুক, পেট ও লেজের তলা হলুদ। মাথা, পিঠ ও লেজের ওপরটা কালচে ধূসর। ডানা কালচে ধূসর এবং তাতে দুটি হলুদ পট্টি রয়েছে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই চোখ বাদামি আর ঠোঁট কালো। পা, পায়ের পাতা, আঙুলও কালো। মূলত পাহাড়-টিলাময় বন ও সুন্দরবনে এদের আবাস। এরা বন ও চষা জমিতে বিচরণ করে। সচরাচর জোড়ায় এবং কখনো বা ঝাঁকে দেখা যায়। শুঁয়াপোকা ও বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ প্রধান খাদ্য। খাবারের সন্ধানে গাছের ডাল থেকে ডালে ঘুরে বেড়ায় এবং খাবার শিকার করে। ‘টিউয়ি-টিউয়ি’ করে বেশ মধুর স্বরে বারবার ডাকতে থাকে। ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর আলতাপরির প্রজননকাল। গাছের সরু শাখায় লতা, শিকড়, লাইকেন, মাকড়সার জাল ইত্যাদি দিয়ে গোলাকার ছিমছাম বাসা বানায়। বাসা বানানো হয়ে গেলে স্ত্রী তাতে দুই থেকে চারটি নীল-সবুজ রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ১৩ থেকে ১৯ দিনে। মা-বাবা দুজনে মিলেমিশে ছানাদের লালন-পালন করে। আয়ুষ্কাল চার থেকে পাঁচ বছর।

নিউজটি আপডেট করেছেনঃ Sylhet 21

কমেন্ট বক্স